ঈমান ফাতওয়া নং. 916

হিজরী সনের সূচনা এবং মুসলিম জীবনে এর গুরুত্ব

July 11, 2026 | ঈমান

দেখতে দেখতে চলে গেল ১৪৪৭ হিজরী। এখন ১৪৪৮ হিজরী সন।  এভাবেই আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একেকটি বছর।

একটি নতুন বছর নানা বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়। এখানে যেমন থাকে নতুন দিন লাভের আনন্দ, তেমনি থাকে জীবন থেকে একটি বছর হারানোর বেদনা।

বছরের গমনাগমনে মুমিনের করণীয় হল– অতীত থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে ভবিষ্যৎকে আরও সমৃদ্ধ করার চেষ্টায় ব্রত হওয়া। নতুন দিনের আনন্দে প্রবঞ্চিত না হয়ে আত্মোপলব্ধি ও জবাবদিহিতার মানসিকতা জাগ্রত করা।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন–

كُلّ النّاسِ يَغْدُو فَبَايِعٌ نَفْسَه فَمُعْتِقُهَا أَوْ مُوبِقُهَا.

প্রতিটি মানুষ সকাল যাপন করে; অতঃপর নিজেকে বিক্রি করে। এভাবে কেউ নিজেকে (আল্লাহ্‌র আনুগত্যে নিয়োজিত করে জীবনকে ধ্বংস থেকে) রক্ষা করে আর কেউ (নফস ও শয়তানের আনুগত্যে নিয়োজিত হয়ে) নিজেকে ধ্বংস করে ফেলে। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৩

দিন গিয়ে রাত আসে। সপ্তাহ ঘুরে মাস কেটে যায়। বারো মাস অন্তর অন্তর নতুন বছর আসে– এভাবেই দিন-রাতের পরিক্রমায় এক সময় জীবন ফুরিয়ে যায়!

মহান রাব্বুল আলামীন জগৎ সংসারের এ নেযাম সাজিয়েছেন উপদেশ গ্রহণের জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন–

تَبٰرَكَ الَّذِیْ جَعَلَ فِی السَّمَآءِ بُرُوْجًا وَّجَعَلَ فِیْهَا سِرٰجًا وَّقَمَرًا مُّنِیْرًا، وَهُوَ الَّذِیْ جَعَلَ الَّیْلَ وَالنَّهَارَ خِلْفَةً لِّمَنْ اَرَادَ اَنْ یَّذَّكَّرَ اَوْاَرَادَ شُكُوْرًا.

কত মহান সেই সত্তা, যিনি আসমানে ‘বুরূজ’ সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে স্থাপন করেছেন উজ্জ্ব¡ল প্রদীপ এবং আলো বিস্তারকারী চাঁদ। এবং তিনিই সেই সত্তা, যিনি রাত ও দিনকে পরস্পরের অনুগামী করে সৃষ্টি করেছেন; (কিন্তু এসব বিষয় উপকারে আসে কেবল) সেই ব্যক্তির জন্য, যে উপদেশ গ্রহণের ইচ্ছা রাখে কিংবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে চায়। –সূরা ফুরকান (২৫) : ৬১-৬২

দিন-রাতের এ পরিবর্তনের চক্রে রয়েছে বহু নিদর্শন হেদায়েত গ্রহণের ও তাকওয়া অর্জনের। আর জ্ঞানীরাই এ থেকে উপদেশ গ্রহণ করে।

আল্লাহ তাআলা বলেন–

اِنَّ فِیۡ خَلۡقِ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ وَاخۡتِلَافِ الَّیۡلِ وَالنَّہَارِ لَاٰیٰتٍ لِّاُولِی الۡاَلۡبَابِ .

নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃজনে এবং পালাক্রমে রাত-দিনের আগমনে বহু নিদর্শন আছে বুদ্ধিমানদের জন্য। –সূরা আলে ইমরান (০৩) : ১৯০

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন–

اِنَّ فِی اخۡتِلَافِ الَّیۡلِ وَالنَّہَارِ وَمَا خَلَقَ اللّٰہُ فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَّقُوۡنَ .

নিশ্চয়ই দিন-রাতের একের পর এক আগমনে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে আল্লাহ যা-কিছু সৃষ্টি করেছেন তাতে সেইসকল লোকের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে, যাদের অন্তরে আছে আল্লাহ্‌র ভয়। –সূরা ইউনুস (১০) : ০৬

আল্লাহ তাআলা চাঁদ ও সূর্যকে বর্ষ গণনা ও হিসাবের মাধ্যম বানিয়েছেন।

চাঁদ সম্পর্কে তিনি ইরশাদ করেছেন–

يَسْـَٔلُوْنَكَ عَنِ الْاَهِلَّةِ قُلْ هِيَ مَوَاقِيْتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ.

তারা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলুন, এটা মানুষের (বিভিন্ন কাজ-কর্মের) এবং হজ্বের সময় নির্ধারক। –সূরা বাকারা (০২) : ১৮৯

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে–

وَّقَدَّرَهٗ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوْا عَدَدَ السِّنِيْنَ وَالْحِسَابَ .

আর (আল্লাহ) তার জন্য নির্ধারণ করেছেন মনযিলসমূহ, যাতে তোমরা বছরের গণনা ও (মাসসমূহের) হিসাব জানতে পার। –সূরা ইউনুস (১০) : ০৫

শরীয়তের বহু বিধান চাঁদের ওপর নির্ভরশীল। ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের তিনটি বিধান– হজ্ব, যাকাত ও রোযার হিসাব চাঁদের সাথে যুক্ত। এছাড়া কুরবানী, ঈদুল ফিতর, লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান, আশুরা, ইয়াওমে আরাফা, আইয়ামে তাশরীক প্রভৃতি বিধানও চাঁদের ওপর নির্ভর করে। তেমনি সন্তানের দুধ ছড়ানোর বছর গণনা, বালেগ গণ্য হওয়ার বছর গণনা, ইদ্দত ইত্যাদি বহু বিধান চান্দ্রমাসের সাথে যুক্ত। কাজেই চাঁদের হিসাব গণনা করা ও তা সংরক্ষণ করা মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

হিজরী সন ও তার সূচনা

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কা মুকাররমা থেকে মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরতের বছর থেকে চান্দ্রমাস কেন্দ্রিক যে সনের গণনা করা হয়, তাকেই হিজরী সন বলে।

হিজরী সনের গণনার পেছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। উমর রা. খেলাফত পরিচালনাকালে বিভিন্ন জায়গায় চিঠি-পত্র প্রেরণ করতেন। কিন্তু তখনও হিজরী সন গণনা আরম্ভ হয়নি। ফলে তার চিঠিতে কোনো সন উল্লেখ থাকত না। এ কারণে অনেক সময় বিড়ম্বনা দেখা দিত। কোন্ চিঠি কবের, তা বুঝতে বেগ পেতে হত।

সে বিবেচনায় আবু মূসা আশআরী রা. উমর রা.-এর নিকট অভিযোগ পাঠান– আপনি বিভিন্ন সময় চিঠি প্রেরণ করেন। তাতে তো কোনো তারিখ থাকে না।

তাছাড়া উমর রা.-এর নিকটও কাগজ-পত্র আসত, সেখানেও সন উল্লেখ থাকত না।

একবার একটা কাগজে শাবান মাস লেখা ছিল। উমর রা. বললেন, কোন্ শাবান? গত বছরের, নাকি এ বছরের, না আগামী বছরের শাবান মাস!

হিজরতের ১৭তম বছরের কথা! এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে উমর রা. সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে নবীজীর হিজরতের বছর থেকে ইসলামী বছর গণনার ফয়সালা করেন। সেসময় তাঁর ঐতিহাসিক ঈমানোদ্দীপক উক্তি ছিল–

الهجرة فرقت بين الحق والباطل، فأرخوا بها.

নবীজীর হিজরত সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্য-রেখা টেনে দিয়েছে। সুতরাং সেদিন থেকেই বর্ষ গণনা কর।

তবে বছর গণনা শুরু হবে কোন্ মাস থেকে?

Leave a Comment